১০২। সূরা আত তাকাসুর (প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা)

সূরার অনুবাদঃ

১ম আয়াতের ‘আলহা’ শব্দটি হলো ‘ইলহা’ শব্দ এর past form. এর মূল শব্দ হলো লাহউ: লাম হা ওয়াও; যার অর্থ বিনোদন। এখানে আলহা অর্থ ফিরিয়ে রাখা বোঝাচ্ছে; অর্থাৎ এমন কম গুরুত্বপূর্ন/গুরুত্বহীন জিনিস বেশি গুরুত্বপূর্ন জিনিস হতে ফিরিয়ে রাখছে। ঠিক যে কাজটি করে বিনোদন। বিনোদন মানুষকে অধিক গুরুত্বপূর্ন বিষয় থেকে ফিরিয়ে রাখে। এখানে পুরো আয়াতে বলা হচ্ছে যে, দুনিয়ায় অধিক লাভের/পাওয়ার মোহ মানুষকে ফিরিয়ে রেখেছে।  
মানুষ একে অপর থকে বেশি পাওয়ার প্রতিযোগিতা করে। এই প্রতিযোগিতা হয় গর্ব, অহংকার ও অন্যকে ছোট মনে করার কারনে। বেশি বেশি চাওয়া বা থাকা খারাপ নয় তবে এর পিছনে উদ্দেশ্য কি সেটাই হলো মূল ব্যাপার। অন্যের থেকে ভাল থাকবো এবং আমার বেশি এজন্য অন্যকে ছোট করবো এইজন্য তাঁর চাইতে বেশি সংখ্যক জিনিস আমার থাকতে হবে এই মানসিকতায় সমস্যা। কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটি এর প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়াতেই সমস্যা।   

কম গুরুত্বপূর্ন বিষয়ের দিকে প্রতিযোগিতা সহকারে ছুটতে থাকার ফলে ব্যস্ততায় সময়ের দিকে খেয়াল থাকে না এবং তা এক সময় মৃত্যুর কাছে নিয়ে আসে। তখন মানুষ বুঝতে পারে তার সময় শেষ। 
২য় আয়াতে যতক্ষন পর্যন্ত না তোমরা কবরে ঘুরে আসো/সফর করো বলা হয়েছে। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, কবর তে যেতে হবে এবং সেটা পার্মানেন্ট না, দুনিয়ার মত এখানেও শুধু সফর করতে হয়।
যিয়ারত শব্দের অর্থ সাময়িক সময়ের পরিদর্শন/ ভ্রমণ। এর পর আসল গন্তব্যে যাওয়া হয় ও সেখানে চুড়ান্ত অবস্থান করা হয়। এর দ্বারা বোঝা যায় দুনিয়া বা কবর আমাদের জন্য সাময়িক অবস্থানের স্থান, আসল গন্তব্যে, চুড়ান্ত অবস্থান স্থল হলো আখিরাত।

এখানে আয়াতে ‘ঝুরতুম’ বলতে কবর এ ভ্রমন করো/যিয়ারত করো বলা হয়েছে। আমরা আসলেই কবর এ চিরজীবন থাকতে যাই না, স্থায়ী বসতি গড়তে যাই না। সবাই কবরে ভ্রমনের পথে আছি। কেউ একটু এগিয়ে, কেউ একটু পিছিয়ে। নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেখানে থাকতে হয় এরপর শুরু হয় কিয়ামত, পরকাল। তাই কবর আমাদের ভ্রমনের জায়গা এবং আমাদের মূল গন্তব্য হলো জান্নাত।      

কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত মানুষ বেশি বেশি পাওয়ার চিন্তায় বিভোর থাকে। কিন্তু কবরে যাওয়ার আগে সব ছেড়ে একদম খালি হাতে তাতে প্রবেশ করতে হয়।      

৩য় আয়াতে আল্লাহ এই ধারনা ও কর্মকান্ডকে সঠিক না বলে অভিহিত করেছেন এবং জ্ঞান বা জানার ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন। সঠিক ভাবে নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি-বিবেক প্রয়োগ না করার কারনে এমনটি হয়। মানুষ এখন তা বুঝতে না পারলেও অচিরেই তারা অবশ্যই জানতে পারবে বলে আল্লাহ নিশ্চয়তা দিয়েছেন ৪র্থ  আয়াতে আগের আয়েতের কথাই আবার বলা হয়েছে। এখানে পর পর ২ বার বলার কারন হতে পারে এটার গুরুত্ব যে বেশি তা বোঝানোর জন্য আবার এটাও হতে পারে যে, মানুষ এটা দুনিয়াতেও এক সময় বুঝবে আর আখিরাতে তো বুঝবেই। অর্থাৎ ২ বার বুঝবে।       

৫ম আয়াতে আল্লাহ জ্ঞান এর কথা বলে বলতে চাচ্ছেন যে আমরা যদি নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে জানতাম এসব কিছু তাহলে এমনটি করতাম না। এখানে আল্লাহই আসলে জ্ঞানের মূল উৎস এবং এই অদেখা বিষয় আল্লাহ জ্ঞান না দিলে আমাদের নিজেদের পক্ষে জানা কখনই সম্ভব ছিল না।     ৬ষ্ঠ আয়াতে আল্লাহ নিশ্চিত করছেন যে জাহান্নামকে আমরা দেখতে পাব। অনেকেই মনে করে মৃত্যু হলেই সব শেষ এরপর কিছু নাই। তাদের জন্য তো বটেই সবার জন্য আল্লাহ বললেন, জাহান্নাম অবশ্যই আছে এবং তা আমরা নিজ চোখেই দেখতে পাব।     

এরপরই ৭ম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন যে, ‘জ্ঞানের ভিত্তিতে বিশ্বাস’ স্থাপন করতে না পারলেও পরে যখন সরাসরি চোখ দ্বারা মানুষ জাহান্নাম দেখবে তখন বিশ্বাস স্থাপন করবে। এটাকে বলা যায় ‘চোখে দেখার ভিত্তিতে বিশ্বাস’; এই বিশ্বাস অনেক বেশি দৃঢ় ও জোরালো।      

সব শেষ (৮ম) আয়াতে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করার বিষয়টি এসেছে। মানুষ আল্লাহর দেয়া কিছু নেয়ামতের (অর্থ, সন্তান ইত্যাদি) দিকে বেশি ঝুঁকে গিয়ে আল্লাহ বিমুখ হয়ে পড়ে। আল্লাহর দেয়া নেয়ামতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে একথা জেনে নেওয়ার জন্য যে; এই নিয়ামত মানুষকে অধিক গুরুত্বপূর্ন বিষয়সমূহ ও আল্লাহ থেকে ভুলিয়ে রেখেছিলো নাকি তা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের উপায় হয়েছিল। 

শেষ আয়াতে বলা হয়েছে যে, নেয়ামতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নিয়ামতসমূহ কি; তার একটা ধারনা এই সূরায় শুরু থেকে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলোঃ  

সময়ঃ সময় মানুষের জন্য অনেক বড় নেয়ামত, তা কিভাবে ব্যয় করা হবে তার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। জ্ঞানঃ এই নেয়ামতটি মানুষকে অন্য সকল সৃষ্টি থেকে শ্রেষ্ঠত্য দান করেছে। জ্ঞান কাজে লাগিয়েই মানুষ ভালো-মন্দ বুঝতে পারে। চোখঃ চোখ তথা অন্যান্য ইন্দ্রিয় আল্লাহর দেয়া বড় নেয়ামত। এই ইন্দ্রিয় এর মাধ্যমেই মানুষ আল্লাহর নিদর্শন উপলব্ধি করে। প্রশ্নঃ প্রশ্নের সম্মুখিন করাটাও আসলে আল্লাহর একটা নিয়ামত। এই প্রশ্ন, বিচার এর কারনেই মানুষ ভালো পথে থাকতে চেষ্টা করে।      

সুতরাং বিভিন্ন জিনিস, নিয়ামত অর্জন করা, বেশি বেশি চাওয়া, পাওয়া এটা খারাপ না যদি না তাঁর উদ্দেশ্য ঠিক থাকে। বেশি ধন সম্পদ থাকলে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে এর হিসাব দেয়া লাগবে। সুতরাং নিয়ামত অর্জন ও গ্রহনের মূলে হিশাব দেয়ার চিন্তা থাকলে তা ক্ষতির কারন হবে না আশা করা যায়।   

আগের সূরার সাথে সম্পর্কঃ আগের ১০০ নং সূরা আল আদিয়াত এ রবের প্রতি অকৃতজ্ঞা, বেশি বেশি ধন-সম্পদ এর লোভে মত্ততা প্রকাশ পেয়েছে। তার পরের (১০১ নং) সূরা আল ক্বরিয়াহ (goo.gl/MkVovG) তে কিয়ামতের ভয়াবহতা প্রকাশিত হয়েছে। অকৃতজ্ঞতা, লোভ ছেড়ে ভালো কাজের উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। কিয়ামতের ভয়াবহতা জেনেও মানুষ তা ভুলে থেকে ধন-সম্পদের লোভে মত্ত রয়ে যায়! এটি বর্নিত আছে এই সূরা আত তাকাসূর এ।    

(৯৯ নং) সূরা আল যিলযাল এ মানুষ উত্থিত হবে ও কর্মকান্ড দেখানো হবে তা বলা হয়েছে। (১০০ নং) সূরা আদিয়াত এ মানুষের কর্মকান্ডের পাশাপাশি মনের লুকায়িত উদ্দেশ্যও চিন্তা প্রকাশিত হবে তা বলা হয়েছে। যেহেতু সকল কর্মকান্ড ও চিন্তা প্রকাশিত হবে তাই এর পরের লজিকাল সিকুয়েন্স হলো বিচার। সেই চুলচেরা বিচার এর কথাই উঠে এসেছে (১০১ নং) সূরা আল ক্বরিয়াহ তে। সবশেষে এই সিরিজের শেষ (১০২ নং) সূরা আত তাকাসুর এ বিচারের পর মানুষের পরিনতি দৃশ্যমান হবে তার বর্ননা এসেছে। এ যেন এক অসাধারন লজিকাল সিকুয়েন্স, Continuous process!      

৯৯ থেকে ১০২ নং সূরা পর্যন্ত মূলত আখিরাত-দুনিয়া-আখিরাত-দুনিয়া এভাবে আবর্তিত হয়েছে। আল্লাহ এভাবে আখিরাত, দুনিয়া, আবার আখিরাত, আবার দুনিয়া এর বিষয় নিয়ে এসে  মানুষকে বারবার সাবধান করেছেন এবং দুনিয়ার সাথে যে আখিরাত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে  জড়িত তা বোঝাতে চেয়েছেন।

আগের সূরা আল ক্বরিয়াহ এর শেষে জাহান্নামে কিছু মানুষ যাবে তা বর্নিত হয়েছে। এই সূরায় শুরুতেই ঐ মানুষদের বৈশিষ্ট্য বর্ননা করে পরিচয় দিয়ে দেয়া হয়েছে। আগের সূরায় ৩য় পুরুষ (3rd person) বাচক শব্দ দ্বারা বর্নিত হয়েছে আর এই সূরায় আরো স্পেসিফিকভাবে বুঝিয়ে দিতে ২য় পুরুষ (2nd person) বাচক শব্দ দ্বারা বর্নিত হয়েছে।      

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ এই (১০২ নং) সূরা আত তাকাসূর এ মূলত বর্ননা করা হয়েছে যে মানুষ গাফিলতিতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে এবং তা তাকে কবর পর্যন্ত পৌছে নিয়ে যায় এবং তা শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম পর্যন্ত নিয়ে যায়। পরের ১০৩ নং সূরা আল আসর (goo.gl/8EdDeU) এ বলা হয়েছে যে ঐ কবরে যাওয়ার আগেই সময় থাকতে জেগে উঠে ভালো কাজ করতে হবে আর যারা না করবে তারা ক্ষতির (‘খুসর’ এর) মধ্যে নিমজ্জিত।      

এই সূরার শেষে বলা হয়েছে মানুষকে নিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে, পরের সূরার শুরুতেই অন্যতম বড় নেয়ামত ‘সময়’ এর কথা বলা হয়েছে। এই সূরায় মানুষ গাফেল থাকে বলা হয়েছে কিন্তু কি থেকে গাফেল থাকে তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। পরের সূরায় মানুষ ৪ টি বিষয় ও কাজ থেকে গাফেল থাকে তা খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।     

উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

সূরাসমূহের নোট

১৮। সূরা আল কাহাফ (গুহা)

১। সূরা আল ফাতিহা (সূচনা)